কোথায় যেতে চাই আমরা

কয়েক হাজার বছরে মানব সভ্যতা এগিয়েছে অনেক। উৎকর্ষতা, অপটিমাইজেশন ও দক্ষতা হচ্ছে এই শতকের মূল মন্ত্র। সেটার প্রয়োজনে যোগ দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। যাকে আমরা ইংরেজিতে বলছি আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স, সংক্ষেপে এআই। মানুষের সহজাত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তার যোগসূত্র না থাকলে পরবর্তী শতকে যাওয়া দূস্কর।

বিশেষ করে মানুষকে এনাবল করতে – তার স্বপ্নের জায়গায় পৌঁছাতে। তার জীবদ্দশায়। প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনায় এসব কিছুই করা সম্ভব অল্প সময়ে।

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এর ব্যবহার ঠিকমত করা গেলে এক জীবনেই অনেক কিছু করতে পারবে মানুষ। সেই দক্ষতা এবং উৎকর্ষের সন্ধানে চলছে গবেষণা। একটি জিনিস লক্ষ্য করবেন মানুষের প্রাথমিক চাহিদা মিটে গেলে সেই একই মানুষ অনেক কাজ ফেরত দিতে পারেন মানব কল্যাণে। সেই কারণে উন্নত বিশ্বের শীর্ষে থাকা মানুষজন “ফিলানথ্রোপিক” অর্থাৎ জনহীতকর কাজে ঝুকে পড়েছেন।

এখন আমর হয়তোবা ৭০-৮০ বছর বাঁচি। এই সময়ের মধ্যে প্রতিটা মানুষকে এনাবল করতে পারলে আমরা দেশ হিসাবে যেতে পারতাম অনেক দূরে।

বাংলাদেশ একটা বিশাল ডেমোগ্রাফি ডিভিডেন্ডের উপর বসে আছে, যেখানে জনসংখ্যা শুমারি বলছে, ৬৬ শতাংশ জনবল কর্মক্ষম থাকবে ২০২০ থেকে। হিসেব বলছে, জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ ১৫ বছরেরও কম। মাত্র ৮ শতাংশের বয়স ৬০-এর উপরে। বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতিকে দেশের উন্নয়নের জন্য একটি ভালো সূযোগ হিসাবে দেখছেন। এই উইন্ডো টা হারানো উচিত হবে না আমাদের। এই সূযোগটা সেরকম থাকবে না ১০-১৫ বছর পরে।

– Demographi Dividend


সরকারের কাছে ডেটা এবং উদ্যোক্তাদের কাছে আছে বুদ্ধি- এই দুটো মিলিয়ে চলছে পৃথিবী। শুরুর দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার “আবহাওয়া” এবং জিপিএস ডেটা উন্মুক্ত করে না দিলে আজ আবহাওয়া এবং নেভিগেশন ব্যবসায় এতো বিলিয়ন ডলার ইনভেষ্টমেন্ট এবং মানুষের জীবন এতোটা সহজ হতো না।

১৯৮৯ সালে ফেডারেল কমিউনিকেশন কমিশন “ওয়াই-ফাই” স্পেকট্রাম উন্মুক্ত করে না দিলে আজকে এই স্পেকট্রাম ঘিরে ট্রিলিয়ন ডলারের ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হতো না। স্পেকট্রাম জাতীয় সম্পদ হলেও সেটার কিছু অংশ বিনামূল্যে ব্যবহার করা হয়েছে সবার স্বার্থে।

আ্যন্টিসিপেটরি গভর্নমেন্ট অর্থাৎ আগাম ধারণার প্রশাসন

ডেটার ভবিষ্যৎ দেখার বৈশিষ্ট্যগুলোকে ব্যবহার করে প্রশাসন একধরনের “আ্যন্টিসিপেটরি গভর্নমেন্ট” অর্থাৎ আগাম ধারণার প্রশাসন তৈরি করতে পারে। মানুষ কালকে অর্থাৎ আগামী মাসগুলোতে যে সমস্যায় পড়তে পারে, সেটা যদি আগেভাগে সমাধান করা যায়, তাহলে কেমন হয়? সেই প্রশাসনকে মানুষ ভালো না বেসে যাবে কোথায়? ডেটাকে ঠিকভাবে আ্যনালাইসিস অর্থাৎ নিরীক্ষণ করলে সামনে কী ঘটতে পারে, সেটা নিয়ে কাজ করছে অনেক দেশের প্রশাসন।

মহামরি এবং প্রযুক্তির ব্যবহার

যখন মহামারি বাড়ছিল তখন জনগণ এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো সরকার এবং স্থানীয় সরকারের কাছে কিছু বুনিয়াদি মানে “ফান্ডামেন্টাল” প্রশ্ন তুলেছিল। আমাদের কাছে কি প্রয়োজনীয় হাসপাতালের বেড আছে? দরকারি মেডিকেল সাপ্লাই এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয় জনবল এই মহামারিকে সাপোর্ট দিতে পারবে কি না? যেহেতু আমাদের দেশ খাদ্যশস্যের ব্যাপারে কিছু দেশের ওপর নির্ভরশীল, সে কারণে প্রশ্ন থাকতে পারে- আমাদের খাদ্যশস্য ফুরিয়ে যাবে কি না?

ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো (ধরুন, পোশাকশিল্প) জিজ্ঞাসা করছিল, তারা তাদের কর্মচারীদের চাকরিতে রাখতে পারবে কি না? এধরনের হাজারো প্রশ্নের মধ্যে সরকারকে নিজেকে চালানোর মতো যথেষ্ট রিসোর্স- যেমন পাবলিক ট্রান্সপোর্টেশন চালূ রাখা, ট্রেন সার্ভিস, পোষ্টাল সার্ভিস চালু রাখার পাশাপাশি খাদ্যশস্যের সাপ্লাই চেইন ঠিকমতো কাজ করছে কি না তার ওপর নজরদারি রাখা, বর্জ্য ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু করে স্কুলগুলো কখন খোলা হবে, সেগুলো নিয়ে সুচারুভাবে কাজ করতে গেলে শুরুতেই দরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

সফটওয়্যার ইজ ইটিং দ্য ওয়ার্ল্ড

২০১১ সালের কথা। কথাটা বলেছিলেন নেটস্কেপের কো-ফাউন্ডার এবং সফটওয়্যার ইন্জিনিয়ার মার্ক আ্যন্ডিসেন। ’সফটওয়্যর ইজ ইটিং দ্য ওয়ার্লড’। কারণ, উনি বুঝেছিলেন একসময় সবকিছুই গিলে ফেলবে সফটওয়্যার। আর তাই উনি ইনভেষ্টমেন্ট করেছিলেন পৃথিবীর সব বড় বড় ‘সফটওয়্যার’ কোম্পানীগুলোতে। ‍উনি ধারনা করেছিলেন, একটা বিরাট ‘শিফট’ হবে হার্ডওয়ার ইন্ডাষ্ট্রি থেকে ‘সফটওয়্যারে’। এই প্রজ্ঞার কারণে উনার একান্ত ব্যক্তিগত নেট আয় ১.৩ বিলিয়ন ডলার।

সরকার এবং প্রাইভেট সেক্টরে প্রচুর কেনাকাটায় একটা বড় অংশ থাকে সফটওয়্যারে। সেখানে আমরা সফটওয়্যা না বুঝলে বাংলাদেশকে কিনতে হবে সফটওয়্যার, বাইরে থেকে চড়া মূল্যে। আমি সেটা দেখছি নিজের চোখে। অনেক দেশ এখন চলছে পুরো সফটওয়্যারে।

বুদ্ধিমান সফটওয়্যার=কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

কেমন হয় সফটওয়্যার যদি নিজেই তার প্যারামিটার ঠিক করে নেয়? সেটা কি সম্ভব? আর সে কারণে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

হাজারো বিজনেস খেয়ে ফেলা সফটওয়্যাকে খেয়ে ফেলবে কে? ঠিক ধরেছেন। ‘এআই’। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। যার শুরুটা ডেটা দিয়ে। অনেক ‘সাইন’ পাচ্ছি হাতেনাতে। আর মাত্র পাঁচ বছর।

ক্লাউড কম্পিউটিং , ডেটা রেসিডেন্সি, তথ্যের নিরাপত্তা

সরকারের নিজের ডেটা সেন্টার তৈরি, ব্যবহার এবং ব্যবস্থাপনা

বর্তমান সময়ের ট্রেন্ড বলছে, ডেটা ধীরে ধীরে আরও বাড়বে এবং সেই ডেটাকে প্রসেস করার মতো স্টোরেজ এবং কম্পিউটেশনাল ক্ষমতা প্রয়োজন হবে সরকারের। সেই প্রসেসিং ক্ষমতা এবং স্টোরেজ যদি সরকারকে কিনতে হয়, তবে ব্যয়বহুল হবে।

ডেটা দেবে সরকার, অ্যানালাইসিস করবে চুক্তিভিত্তিক কোম্পানি

ক্লাউড অর্থ, সব সমস্যা মেটাবে সার্ভিস প্রোভাইডার

সরকারি অফিসের বিভিন্ন হার্ডওয়্যারের কারণে ডাউনটাউম, সফটওয়্যারের ভুল কনফিগারেশন, অফিসের সুরক্ষা লঙ্ঘন অর্থাৎ‘সিকিউরিটি ব্রিচ’ এবং ডেটা লস অর্থাৎ ডেটা হারানো- এ ধরনের সমস্যাগুলো প্রতিনিয়ত বিপদে ফেলছে সরকারি অফিসগুলোকে। অথচ এ ধরনের সার্ভিসগুলোর ‘এন্ড টু এন্ড’ পুরো দায়িত্ব এবং মাথাব্যথা ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে ক্লাউড কমপিউটিং সার্ভিস- প্রোভাইডারের কাছে। যার কাজ তাকে করতে দেওয়া উচিত, এতে সবারই সুবিধা হয়। একটা সরকারি অফিস নেটওয়ার্কের বিভ্রাটে জনগনের সার্ভিস ব্যাহত হয়।

যন্ত্রের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা

একটা যন্ত্রের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তেরি হলে আমরা সেটাকে বুদ্ধিমত্তার একটা চিহ্ন হিসেবে বলতে পারি। একটা বুদ্ধির এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে। যেহেতু বুদ্ধিমত্তাটা কোনো জৈব বা ‘অর্গানিক” মানে প্রাণী থেকে আসছে না, সে কারণে এটাকে সিন্থেটিক মানে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বলা যেতে পারে।

চারটি ডাইমেনশন

1.মানুষের মতো চিন্তা করতে পারা

2.যুক্তিযুক্তভাবে চিন্তা করতে পারা

3.মানুষের মতো কাজ করতে পারা

4.যুক্তিযুক্তভাবে কাজ করতে পারা

রাষ্ট্রের বয়সের সাথে সাথে পাল্টাতে থাকবে প্রশাসনের মানবিক আচরণ। ইউরোপের ইতিহাস পড়লে বোঝা যায়, কীভাবে ইউরোপ এখন এতো উন্নত মানবিক চিন্তা করছে? অথচ, তাদের রক্তারক্তির ইতিহাস খুব আগের নয়।মানুষ ভুল করে এবং সেই ভুলের জন্য সাজাপ্রাপ্ত হয় প্রচলিত আইন অনুসারে।

তবে, এর পাশাপাশি মানুষ কেন ভুল করছে অথবা কোন সমস্যার প্রেক্ষিতে একজন মানুষ একটা বেআইনি কাজ করেছে, সেটা দেখার সময় এসেছে। এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে কোন পরিবেশে কী ধরনের অপরাধ হচ্ছে এবং সেই অপরাধের মূল সমস্যা খুঁজে বের করে সমাধান করছে অনেক উন্নত দেশ।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আমাদের বিচারব্যবস্থার সংস্কার (আসছে সিরিজ হিসেবে) এবং বর্তমানে যারা বিভিন্ন অপরাধে দন্ডিত হয়ে কারাগারে সময় কাটাচ্ছেন, সেটার সময়সীমা পুনর্বিবেচনা করার সময় এসেছে।