নীরব অর্থনৈতিক বিপ্লব কী এবং কেন?

আমাদের দেশের অর্থনীতি মূলতঃ বিদেশী সাহায্য ‍নির্ভর। সমাজ ও সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কহীন পশ্চিমা মডেলের আলোকে পরিচালিত হচ্ছে এই অর্থনীতি। আমাদের অর্থনীতি কৃষিভিত্তিক ও নিজস্ব একটি সনাতন (Traditional) গতিতে চালিত। এটা বাজার অর্থনীতিভিত্তিক নয়। তাই বলে ‘বাজার’ পুরোপুরি উপেক্ষিতও নয়। কিন্তু একটি স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য বর্তমান অবস্থা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এর জন্য চাই অর্থনীতির আমূল পরিবর্তন। এদেশ ও সমাজ, মাটি ও মানুষকে ভালোভাবে উপলব্ধি করে তার ভিত্তিতে একটি নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য। উন্নয়নকে করতে হবে সংস্কৃতিমুখী। উন্নয়ন হতে হবে সুনির্দিষ্ট পর্যায়ে। যাতে তা এই মাটিওমানুষের জীবনআচরণ ও স্বভাবপ্রকৃতিরসাথে সামঞ্জস্যপূর্ন হয়। যদি তা করা যায় তাহলেই সেটা হবে এক নীরব বিপ্লব।

একবিংশ শতাব্দীতে যেসব নতুন সামাজিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে তা অতীত বা প্রচলিত কোন ধ্যান-ধারণায় ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। আমাদের দরিদ্রতা বেড়েই চলেছে। প্রতি বছর প্রচুর বিদেশী সাহায্য আসছে; কিন্তু সত্যিকার অর্থনৈতিক উন্নতি বলতে যা বুঝায় তা আমাদের হচ্ছে না। বিদেশী সাহায্য, দারিদ্র্য বিমোচন বদলে সহায়তা করছে সর্বব্যাপী দুর্নীতি সৃষ্টিতে। বিদেশী অনুদান আসায় এখানকার সামাজিক‘এনাটমী’ নিয়ে চিন্তার অবকাশ হচ্ছে কম। প্রত্যেকটি বিদেশী অনুদানের সাথে দাতাদের একটি করে ‘প্রেসক্রিপশন’ থাকে। যারা অনুদান দিচ্ছে, এ সমাজের অন্তর্নিহিত অবস্থা সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই।  তারা তাদের চিন্তা-চেতনা অনুযায়ী অনুদান দেয়। ভিক্ষুকের কোনো পছন্দ থাকতে পারে না। এটা দোষের নয়। কারণ যে টাকা দিবে,সেই টাকা ব্যবহারের উপায় বাতলে দেয়ার অধিকার তার থাকতেই পারে; কিন্তু অন্যদিকে, অনুদান পাওয়ার লক্ষ্যে আমরা করছি কি? নিজেদের সমস্যা আমরা যতটা না বুঝতে চেষ্টা করছি,তারচে ; বেশী ব্যস্ত থাকছি সাহায্যদাতার দেয়া প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী চলতে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপকে পুনর্গঠনের জন্য ‘মার্শাল প্লান’- এর আওতায় ‘একশ’ কোটি ডলারের মতো সহায্য দেয়া হয়েছিল। সেই সাহায্যের মাধ্যমে ইউরোপ আবার মাথা তুলে দাঁড়ায় অন্যদিকে, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সাহায্য পেয়েছে 2শ’80 কোটি ডলার ; কিন্তু এই বিপুল সাহায্য বাংলাদেশকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিতে পারেনি।

 

সমস্যার মূল কারণ

দাতারা সাহায্যের সাথে যেসব শর্ত জুড়ে দেয়, আমরা আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে সে সব শর্তের যথার্থতা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হই। পশ্চিমা দাতারা অনুদান দেয় মুক্তবাজার অর্থনৈতিক ধ্যান-ধারণা ওপর ভিত্তি করে ;কিন্তু আমাদের সমাজ মুক্তবাজার অর্থনৈতির সমাজ নয়। এই সমাজের অবস্থা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে এটি মূলতঃ একটি  কৃষিভিত্তিক সনাতন সমাজ। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রিত ও বাজার অর্থনীতিও চলছে। সেই সাথে সর্বশেষ যুক্ত হয়েছে ইসলামী অর্থনীতি। তবে বাংলাদেশী সমাজের মূল বৈশিষ্ট্য সনাতন অর্থনীতি।  এই সনাতন অর্থনীতি মূলতঃ ইসলামিক কৃষ্টির সাথে যুক্ত; কিন্তু এই কৃষ্টিকে আর্থিককরণের কোন চেষ্টা কখনো করা হয়নি।

যেসব অনুমানের ওপর ভিত্তি করে ‘ম্যাক্রো ইকোনমিক্স’ গড়ে উঠেছে তার সাথে পাপুয়া নিউগিনির অর্থনীতির কোন মিল নেই।

আমাদের মাইক্রোক্রেডিট সিস্টেমে নারীকে ক্ষমতায়নের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এই ক্ষমতায়নের প্রক্রিয়া এমন যে, তা এখানকার সামাজিক পরিবেশে গ্রহণযোগ্য নয়। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, কোন গ্রামে হয়তো 5শ’ পরিবার রয়েছে। সেখানে নারী ক্ষমতায়নের নামে যদি একজন বা দু’জন নারীকে পশ্চিমা ধ্যানধারণায় উদ্বুদ্ব করা হয় বা সে রকম চালচলনে অভ্যস্ত করা হয় তাহলে হয়তো কেউ কিছু বলবে না; কিন্তু ,যদি দেখা যায়, ওই গ্রামের চারশ’ মহিলাকেই কথিত প্রগতির নামে সাইকেল দিয়ে রাস্তায় বের করে আনা হয়েছে, তাহলে সেটা সামাজিকভাবে গ্রহণ করা হবে না বলে মনে হয়। কারণ, এদেশের মানুষের সংস্কৃতি ও ইসলামে এটা সমর্থনযোগ্য নয়। এমনকি এখানকার অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের কাছেও তা গ্রহণযোগ্য হবে না। বাংলাদেশের প্রায় 87 হাজার গ্রামের কোথাও এ ধরণের কল্পনার বাস্তব রুপায়ণ সম্ভব নয়। আমেরিকা বা ইউরোপে এটা সম্ভব হতে পারে কিন্তু এখানে নয়।

এখানেই অর্থনীতি এসে সংস্কৃতির সাথে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছে। ফলে এই দ্বন্দ্ব দূর করা না গেলে বা এদেশের সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিকূল কোন কর্মসূচি দিয়ে নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়। সম্ভব নয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের। আবার কোন প্রান্তিক পরিবর্তন দিয়েও এই সমাজকে নতুন রূপে ঢেলে সাজানো সম্ভব নয়। এর জন্য চাই বৈজ্ঞানিক বিপ্লব। ধারাবাহিক অগ্রগতি নয়, চাই বিচ্ছিন্ন উল্লস্ফন। যেখানে অতীত ধ্যান-ধারনার সাথে কোন যোগ নেই। যোগ থাকলেও সেখানে সবকিছু নতুনভাবে দেখার চেষ্টা হবে। নীরব বিপ্লব হবে তখনই যখন আমাদের সমাজব্যবস্থার নিয়মকানুন ও ত্রূটি বিচ্যুতিগুলো বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যাচাই-বাছাই করে নতুন কিছু হাজির করা যাবে।

জাতির ভাগ্য বদলাতে চাইলে চিন্তাধারায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন, বিদেশী সাহায্য ছাড়াই চলার চিন্তা একটি বৈপ্লবিক চিন্তা হতে পারে; কিন্তু সাহায্য ছাড়া চলতে গেলে প্রয়োজন হবে নিজস্ব সম্পদ সমাবেশের। আর সেজন্য চাই নতুন অর্থনৈতিক মডেল। সেই মডেল উদ্ভাবনই হবে প্রকৃত কাঠামোগত পরিবর্তন।

সম্প্রতি এক হিসাবে দেখা যায় যে, ব্যাংকের দেয়া হাজার কোটি টাকা ঋণের 40% আছে 156 জন লোকের হাতে এবং 75% ঋণ নিয়েছে মাত্র 1800 জনে।

প্রতিযোগিতামূলক মুক্তবাজার অর্থনীতির পক্ষে চিৎকার করা হলেও বিশ্ব অর্থনীতি ক্রমেই 5 থেকে 6টি বহুজাতিক কর্পোরেশনের হাতে বন্দী হয়ে পড়েছে। আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার মোট বিনিয়োগের 60% ঢাকা 20% চট্টগ্রামে এবং বাকি 20% অন্যান্য স্থানে বিনিয়োগ করা হয়।

বিশ্বব্যাংক তথা আইএমএফ সম্পূর্ণ আমেরিকার তথা কতিপয় ধনীদেশের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া, বর্তমানে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভ কিছু সংখ্যক ধনী লোকের দ্বারা  পরিচালিত হচ্ছে। আমেরিকায় তাই কোন কেন্দ্রীয় ব্যাংক নাই।

পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে পাশ্চাত্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার স্থির হয়ে আছে যা আজ মাত্র 1.1 শতাংশে দাঁড়িয়েছে যাহা একটি সভ্যতার মৃত্যুর সংকেত বহন করে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় পাশ্চাত্যে সভ্যতার পতন ঘটবে যেমনভাবে অতীতে অনেক সভ্যতা বিলীন হয়ে গেছে। এই শতাব্দীর মধ্যেই এই ঘটনা ঘটলে আমরা বিস্মিত হবো না।

পারিবারিক সম্পদ এবং ওয়াকফ্ সম্পত্তির উদ্ভবঃ

এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ক্যাশ ওয়াকফে্র আন্তর্জাতিকরণের মাধ্যমে ওয়ার্ল্ড সোস্যাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিতে হবে।

ক্যাশ ওয়াকফ্ সাদকাহ থেকে ভিন্ন। সাদকার ক্ষেত্রে লাভ এবং একই সাথে মূল জিনিসটি হস্তান্তর করা হয় কিন্তু ক্যাশ ওয়াকফ্ এর ক্ষেত্রে মূল জিনিসটি রেখে দেয়া হয়। আর লাভটি ওয়াকফ্ এর উপকারভোগীর কাছে চলে যায়। ক্যাশ ওয়াকফ্ আন্তর্জাতিকরণের মাধ্যমে যদি প্রতি মুসলমানের নিকট থেকে এক ডলার সংগ্রহ করা যায় তবে মাসে 160 কোটি ডলার এবং বছরে 18’শ কোটি ডলার সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। আর সংগৃহীত অর্থের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ দিয়ে যেকোন আন্তর্জাতিক ব্যাংক তথা ওয়ার্ল্ড সোস্যাল ব্যাংকের পেইড-আপ ক্যাপিটাল গঠন করা যেতে পারে। ক্ষুদ্র ঋণের বৃহৎ ব্যবসা বন্ধ করে প্রস্তাবিত বিশ্ব সামাজিক ব্যাংকের মাধ্যমে জিরো প্রফিট রেট অথবা জিরো ইন্টারেস্ট রেটে ক্ষুদ্র ঋণ দেয়া সম্ভব।

এমন দুরাবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য বিকেন্দ্রিকরণ এর কোনো  বিকল্প নেই। আপাতত বাংলাদেশকে 4টি প্রভিন্স- এ ভাগ করে বঙ্গবন্ধুরৈ ঐতিহাসিক 6 দফা আন্দোলনের আঙ্গিকে ফেডারেল সিস্টেম করা যেতে পারে এবং ঢাকা থাকবে ফেডারেল ক্যাপিটাল।

এক হিসেবে দেখা যায় উক্ত মোট ডিপোজিটের শতকরা প্রায় 60 ভাগ টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে ঢাকায় , 20 ভাগ চট্টগ্রামে এবং বাকি 20 ভাগ সমগ্র দেশে। এতে সুষম উন্নয়ন হচ্ছে না।

প্রশাসনের বিকেন্দ্রিকরণ ও গ্রামমুখী উন্নয়ন ধারার প্রবর্তন করা জরুরী।

একবিংশ শতাব্দী এবং তার পরবর্তীকাল মুসলিম রাষ্ট্র বিশেষ করে বাংলাদেশ উন্নয়নের স্বর্ণযুগের দ্বারপ্রান্তে। এই ঐতিহাসিক ঘটনা যে ঘটতে যাচ্ছে সেই Code of time কে Decode করা বিশেষ জরুরি হয়ে পড়েছে এবং প্রজন্মকে এই চ্যালেঞ্জ মোকবেলার জন্য নতুন ধারার রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা দরকার।

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কিউবাতে সরকারের উদ্যোগে প্রতিষেধকমূলক ব্যবস্থা নিয়ে স্বাস্থ্য সেবার যে উন্নতি হয়েছে তাতে মাথাপিছু খরচ প্রায় 400 ডলার যেখানে আমেরিকাতে অনুরূপ স্বাস্থ্য সেবা পেতে খরচ হবে প্রায় 22 গুন অর্থাৎ প্রায় 9000 ডলার। হিসার করে দেখা গেছে রোগের প্রতিরোধ, রোগের চিকিৎসার তুলনায়  2‘শ ভাগ সাশ্রয়ী।

এই হাসপাতালের মূল লক্ষ্য হলো আপনাকে অসুস্থ হয়ে যেন হাসপাতালে না আসতে হয়। ক্রমান্বয়ে যেন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আসাটা সীমিত হতে থাকে;

ফরমালিনমুক্ত নিজ বাগানের মৌসুমি ফল, সুস্বাস্থ্য ও ডায়াবেটিক রোগীর খাবার এবং সবার জন্য ক্যান্টিন ও কফি হাউজ থাকবে;

একটি ক্ষুদ্র পদক্ষেপ এক হাজার মাইল যাত্রার একটি অংশ। আসুন আমাদের ছোট ছোট উদ্যোগ নিয়ে এক বিশাল সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলি। এভাবে ত্যাগ , দান সমবেত অংশগ্রহণের মাধ্যমে জীবনের মূল লক্ষ্য অর্জন করা যেতে পারে।

আবার কর্মক্ষেত্রে গিয়ে এদের যদি নৈতিক অধঃপতন ঘটে, কেউ যদি দু্র্নীতিপরায়ণ হয়ে পড়ে তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় তার ডিগ্রি বাতিল করে দিতে পারবে। অন্যদিকে, সে যদি ভালো কোনো কাজ করে, সমাজ ও মানবতার কল্যাণে অবদান রাখে তাহলে তাকে ডেকে পুরস্কৃত ও সম্মানিত করা হবে।

আমেরিকায় একজন MD বা ডাক্তার হতে গেলে খুব কঠিন একটি শিক্ষা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হতে হয়; কিন্তু এরপরও যে ডিগ্রি তাকে দেয়া হয় তা কিন্তু সারা জীবনের জন্য নয়।  মাত্র 10 বছরের জন্য।

‘দি গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি অব ইসলামিক ফাইন্যান্স এন্ড টেকনোলজি’

মধ্যপ্রাচ্যের নব্য ইসলামিক ফাইন্যান্স এবং ওয়েলথ্ এর প্রায় অলস পড়ে থাকা 8 শত বিলিয়ন মার্কিন ডলারকে  আকৃষ্ট করার জন্য এ বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বমানের পেশাগত দক্ষ জনশক্তি সরবরাহ করতে পারবে।

‘‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।’’

যারা এই কর আদায়ের সাথে জড়িত তারা উৎকোচের বিনিময়ে করদাতার করযোগ্য বিষয়- সম্পত্তিকে কম করে দেখায়। ফলে, সরকার প্রকৃত কর থেকে বঞ্চিত হয়। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকার ক্যাশ ওয়াকফ্ সার্টিফিকেট বা বন্ড প্রবর্তন – এর মাধ্যমে জনগনকে এমন সব সামাজিক খাতে অর্থ খরচে উদ্বদ্ব করতে পারে যেখানে প্রতিবছর রাজস্বের একটি বড় অংশ ব্যয় হয়।

ফান্ডের সদস্যদের বলা হবে যে, সরকার তাদের কাছ থেকে কোনো আয়কর নেবে না, কিন্তু প্রত্যেকের জন্য নির্ধারিত করের টাকা তাদেরই মাধ্যমে “ক” বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার কাজে ব্যয় হবে।

ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখব শিক্ষা, স্বাস্থ্য এসব খাত সব সময় জনগণ সামাজিক খাত হিসেবেই পরিচালনা করেছে। ওয়াকফ্ সম্পদের মাধ্যমেও এসব পরিচালিত হয়েছে। ফলে, সেই শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে এমন বহু রত্ন জন্ম নেয় যাদের চিন্তাধারা সমকালীন বিশ্বের চেহারাই পাল্টে দিয়েছিল।

সরকারের রাজস্ব ব্যয় কমাতে সেনাবাহিনীকে‘ সোস্যাল আর্মি’তে রূপান্তরিত করার চিন্তা করা যেতে পারে।

মুসলমানরা সর্বপ্রথম বাগদাদে ব্যাংকিং সার্ভিসের প্রবর্তন করে। সে সময় সওদাগররা মুসলিম জাহানের এক প্রান্তে বসে চেক লিখে দিলে তা অন্য প্রান্তে নিয়ে ভাঙানো যেত। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের দক্ষ পেশাজীবী ও ট্রেড গাইড নিয়োগ করা হয়েছিল।

ফেরি ঘাট থেকে কুষ্টিয়া যেতে সড়কটির যে দুরাবস্থা তা কল্পনাতীত। আমার জীবনে এমন রাস্তা দেখিনি। একটি প্রাচীন জেলা শহরের মূল সড়কটি হলো এর প্রাণ। এর মাধ্যমে সে অঞ্চলের অধিকাংশ বাণিজ্যিক কর্মকান্ড সম্পন্ন হয়। অথচ সড়কটি দেখলে মনে হবে কোনো প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষে যাওয়ার পথ। এর পরেই একজন রাজনৈতিক প্রভাবশালীর বাড়ির কাছাকাছি প্রায় 5 মাইল দীর্ঘ এমন সুন্দর সড়ক করা হয়েছে যে, দু’সড়কের তুলনা চলে না। অথচ এই সড়কে লোক চলাচল তেমন নেই, জঙ্গল ঘেরা। অর্থাৎ অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে এর অবদান এতই সামান্য যে তা হিসেবে না আনলেও চলে।

প্রতিযোগিতামূলক মুক্তবাজারের অর্থনীতির পক্ষে চিৎকার করা হলেও বিশ্ব অর্থনীতি ক্রমেই 5 থেকে 6টি বহুজাতিক কর্পোরেশনের হাতে বন্দী হয়ে পড়েছে। বিশ্বের প্রায় 80 থেকে 90 শতাংশ খাদ্য ও পানীয়, কৃষিজাত কাঁচামাল, খনিজ ও ধাতব পদার্থের রফতানী এদের মাধ্যমে হয়।

বিশ্বায়ন দরিদ্র দেশগুলোর ঘাড়ে ক্রমাগত চেপে বসেছে সিন্দাবাদের ভূতের মতো। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমা অর্থনৈতিক শক্তি যেভাবে গরীব দেশগুলোকে নতুন কায়দায় ও শোষণ করা শুরু করেছে, সে বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

এদেশে দেড় লাখেরও বেশি ওয়াকফ্ সম্পত্তি রয়েছে এবং প্রায় পৌণে তিন লাখ মসজিদ সম্পত্তি ওয়াকফ্ সম্পত্তির সাথে যুক্ত। অথচ এসব সম্পদ বাণিজ্যিকভাবে উন্নয়নের চিন্তা করা হয়নি কখনো। তা করা গেলে সরকারের সমাজ কল্যানমূলক বহু কর্মকান্ডকে ওয়াকফ্- এর আওতায় নিয়ে আসা যেত। ফলে, রাজস্ব সাশ্রয় হতো। এক জরিপে দেখা যায়, ওয়াকফ্ খাত থেকে সরকারের 25 শতাংশ রাজস্ব আসতে পারে।

ওয়াকফ্ –এর সৌন্দর্য্য হলো মূল সম্পদ অক্ষুন্ন রেখে সেখান থেকে অর্জিত আয় বিভিন্ন  জনকল্যানমূলক কাজে ব্যয় করা।

অটোম্যান যুগে ওয়াকফ্ প্রশাসন ব্যাপক পর্যায়ে সম্প্রসারিত হয়েছিল তুরস্কে। 1925 সালের এক পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, এই মুসলিম দেশটির মোট কৃষিযোগ্য ভূমির 3 ভাগই ছিল ওয়াকফ্- এর অন্তর্ভূক্ত।

যুক্তরাষ্ট্রের মুসলমানরা যদি মাসে একটি করে হ্যামবার্গার কম খেয়ে তার দাম দিয়ে ক্যাশ ওয়াকফ্ সার্টিফিকেট কেনেন, তাহলে বছরে এক বিলিয়ন ডলার সংগৃহীত হতে পারে।

জাকাত আদায়ে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের মজুরী প্রদান এবং আল্লাহর রাস্তায় খরচ।

অলস সম্পদের ওপর 2.5% , কৃষি সম্পদের ওপর 10% বা ২0%, খনিজ সম্পদের ওপর ৫% জাকাত আরোপের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে সমগ্র জাতীয় সম্পদকেই জাকাতের আওতাভুক্ত করা হয়েছে তথা, দারিদ্র্য দূরীকরণার্থে নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

সাধারণভাবে ইসলামী করকে কয়েক শ্রেণীতে ভাগ করা যায়, যথাঃ

(ক) জাকত,(খ) যিজিয়া,(গ) খারাজ বা ভূমিকর, (ঘ) যুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদ, (ঙ) খনিজ সম্পদের ওপর কর, (চ) আমদানি-রপ্তানি শুল্ক প্রভৃতি। ইসলামের প্রাথমিক যুগের কর ব্যবস্থা ছিল নমনীয় ও গতিশীল।

সর্বোপরি এ সার্টিফিকেট তিনি কিনতে পারেন চারটি কল্যাণময় বিনিয়োগ উদ্দেশ্য সামনে রেখে।

1) নিজের কল্যাণ (ইহকালীন/পরকালীন)

2) পরিবারের কল্যাণ(ইহকালীন/পরকালীন)

3) সামাজিক কল্যাণ ও বিনিয়োগ

4) দরদি সমাজ গঠনঃ গরীরদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা এবং সচ্ছল ও বিত্তশালীদের জন্য সামাজিক শান্তি।

ক্যাশ ওয়াকফ্ হতে পারে আয়করের বিকল্প

ধরা যাক, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা 15 কোটি যার মধ্যে প্রায় 13 কোটি মুসলমান। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে বাংলাদেশের প্রতিটি মুসলিমদের নিকট থেকে গড়ে মাসিক 100 টাকা ক্যাশ ওয়াকফ্ হিসেবে সংগ্রহ করলে 13 কোটি মুসলিমের নিকট থেকে প্রায় 13,000 কোটি (তের হাজার কোটি) সংগ্রহ করা যায়।

ক) প্রতিটি দেশকে মুসলিম ও অমুসলিম দেশগুলোর তৃণমূল পর্যায়ে কমপক্ষে 1 কোটি পরিবার ক্ষমতায়ন ঋণ কর্মসূচী চালু।

খ) শিক্ষা,স্বাস্থ্য ও গবেষণা খাতে সহায়তাদানের জন্য নগদ ওয়াকফ্ সার্টিফিকেট বিক্রির মাধ্যমে 1শ’ কোটি মার্কিন ডলারের একটি তহবিল গঠন এবং আন্তর্জাতিক জনমত সৃষ্টি করতে হবে।

দেশে 20 হাজার ক্ষুদ্রঋণ দানকারী সংস্থা বছরে 12 হাজার কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে। এ ঋণের চার কোটি গ্রাহক থাকা সত্বেও আমাদের দারিদ্র্যের হার পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি।

আর এই সংগৃহীত অর্থের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ দিয়ে যেকোনো আন্তর্জাতিক ব্যাংক তথা বিশ্ব সামাজিক ব্যাংকের পেইড-আপ ক্যাপিটাল (paid-up capital) গঠন করা যেতে পারে।

সভায় আরও উল্লেখ করা হয় যে , ক্ষুদ্রঋণের বৃহৎ ব্যবসা বন্ধ করে প্রস্তাবিত বিশ্ব সামাজিক ব্যাংকের মাধ্যমে ‘Zero profit rate or Zero Interest rate’ এ ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া সম্ভব।

সবুজ হাট ধারণায় উন্নয়নকে শহরমুখী না করে গ্রামমুখী করার কথা চিন্তা করা হয়েছে। অর্থের প্রবাহ গ্রাম শহরমুখী না করে শহর থেকে গ্রামমুখী করার কথা ভাবা হয়েছে, যা প্রচলিত উন্নয়ন ধারণার সম্পূর্ণ উল্টো।

বাংলাদেশে জনসংখ্যা ঘনত্বের কারণে একটি সবুজ হাট প্রকল্প পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে এর আওতায় 30/40 লাখ মানুষ চলে আসবে। আগেই বলা হয়েছে সবুজ হাট প্রকল্পের আওতাধীন এলাকায় ভোক্তা প্রকৃতি হবে সমজাতিক।

সময় এসেছে সাধারণ মানুষের সমাজ সংঘ (Commonwealth of Human Communities) গঠনের।